৩রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
৩রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
১৮ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২১শে রবিউস সানি, ১৪৪৮ হিজরি

দিন বদলের গল্প, বদলায় না মানুষের দিন!

spot_img

মোঃ মুঞ্জুরুল ইসলাম রিপন:

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে—প্রতিদিনই আমরা এই গল্প শুনি। উন্নয়নের গল্প শুনি, বড় বড় প্রকল্পের গল্প শুনি, অর্থনৈতিক অগ্রগতির গল্প শুনি। সভা-সমাবেশে বক্তৃতা হয়, সংবাদপত্রের পাতায় শিরোনাম হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উন্নয়নের ছবি ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু এই গল্পের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর গল্প কে বলবে?

রোদে পোড়া মাঠে দাঁড়িয়ে থাকা কৃষক রমজান আলী কি জানেন দেশের অর্থনীতি কতটা এগিয়েছে? তিনি শুধু জানেন, সার-বীজের দাম বেড়েছে, সেচের খরচ বেড়েছে, শ্রমিকের মজুরি বেড়েছে। ফসল ঘরে তুলেও হিসাব মেলে না। কৃষকের ঘামে যে অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে, সেই অর্থনীতির লাভের হিসাব করতে বসলে রমজান আলীর খাতায় কেন বারবার লোকসান লেখা পড়ে—এই প্রশ্নের উত্তর কোথায়?

শহরের এক মুদিদোকানে দাঁড়িয়ে মতি’র মা সয়াবিন তেলের দাম শুনে ক্ষুব্ধ হন। দাম বাড়ে, সংসারের বাজেট ছোট হয়। একসময় যে বাজারের তালিকায় দশটি পণ্য ছিল, সেখানে এখন পাঁচটি পণ্য রাখতেই হিসাবের খাতা লাল হয়ে যায়।
মুদিদোকানিও খুব একটা স্বস্তিতে নেই। পাইকারি বাজারে দাম বাড়লে তাকেও বাড়াতে হয়। কিন্তু ক্রেতার রাগ গিয়ে পড়ে দোকানির ওপর। বাজারের এই অদৃশ্য আগুনে আসলে দুই পক্ষই পুড়ছে।

আর বেসরকারি চাকরিজীবী রহিম মিয়া?
মাসের প্রথম সপ্তাহে বেতন হাতে পেয়ে তিনি হয়তো কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। বাড়িভাড়া, সন্তানের স্কুলের খরচ, বাজার, বিদ্যুৎ, গ্যাস, চিকিৎসা, যাতায়াত—এক এক করে সব খরচ বেতনকে গিলে ফেলে। মাসের পনেরো দিন না যেতেই পকেট প্রায় শূন্য।
বাকি পনেরো দিন চলে হিসাব করে, ধার করে, কখনো প্রয়োজন বাদ দিয়ে।
অথচ সংবাদপত্র খুললেই তিনি পড়েন—‘উন্নয়নের মহাসড়কে দেশ।’
করিম মিয়াও প্রতিদিন খবরের কাগজ পড়েন। তিনি দিন বদলের গল্প পড়েন। উন্নয়নের গল্প পড়েন। নতুন সম্ভাবনার কথা পড়েন।
কিন্তু তাঁর নিজের দিন বদলায় না।
করিম মিয়ার ঘরের টিনের চাল হয়তো আগের মতোই ফুটো। সন্তানের পড়াশোনার খরচ নিয়ে তাঁর দুশ্চিন্তা আগের মতোই। বাজারের ব্যাগ আগের চেয়ে হালকা। স্বপ্নগুলোও যেন ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে।

তাহলে প্রশ্ন জাগে—উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু কার জীবনে?
দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেই অগ্রযাত্রার সঙ্গে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার স্বস্তি কেন সমানতালে এগোয় না?
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেক ভয়ংকর বাস্তবতা—দুর্নীতি ও অনিয়ম।
দুর্নীতি যেন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; কোথাও কোথাও এটি ব্যবস্থার অংশ হয়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে। উন্নয়নের নামে প্রকল্প আসে, বরাদ্দ আসে, রাস্তা হয়, সেতু হয়, ভবন হয়। কিন্তু কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কোথাও প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন, কোথাও বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন, কোথাও আবার জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন।

জনগণের টাকা দিয়ে তৈরি উন্নয়ন যদি জনগণের জীবনেই স্বস্তি না আনে, তাহলে সেই উন্নয়নের সাফল্য মাপার মানদণ্ড কী?
রাজনীতির ক্ষেত্রেও সংকট কম নয়।
রাজনীতি হওয়ার কথা ছিল মানুষের অধিকার আদায়ের হাতিয়ার। অথচ ক্ষমতা, প্রভাব, অর্থ ও ব্যক্তিস্বার্থের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বারবার। ব্যবসা ও রাজনীতির সম্পর্কও এখন জনআলোচনার বিষয়।
রাজনীতি যদি মানুষের সেবা থেকে সরে গিয়ে কেবল ক্ষমতার হিসাব হয়ে ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য সেই রাজনীতির মূল্য কোথায়?
চারদিকে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদক, নারী নির্যাতন ও ধর্ষণের খবর আমাদের প্রতিদিনের সংবাদে জায়গা করে নেয়। একটা সময় এসব খবর মানুষকে আতঙ্কিত করত। এখন যেন অনেকেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
আর কোনো সমাজ যখন অন্যায়কে দেখে অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন সেটিই সবচেয়ে ভয়ংকর সংকেত।

গ্রাম থেকে এক মুঠো সুখের আশায় শহরে এসেছিলেন কদম আলী। অটোরিকশার হ্যান্ডেল ধরে তিনি প্রতিদিন শহরের রাস্তায় ছুটে বেড়ান। তাঁর অটোরিকশার চাকা ঘোরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত।
কিন্তু কদম আলীর ভাগ্যের চাকা কি ঘোরে?
হয়তো তাঁর উত্তর—‘চাকা ঘোরে, জীবন ঘোরে না।’
এই শহরেই আরেক বাস্তবতা—মাদক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত আসক্তিতে হারিয়ে যাচ্ছে অনেক কিশোর-তরুণ। যাদের হাতে থাকার কথা বই, বিজ্ঞান, সৃজনশীলতা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন, তাদের কেউ কেউ ডুবে যাচ্ছে মাদকের অন্ধকারে, কেউ আবার ভার্চুয়াল জনপ্রিয়তার মোহে।
কখনো কখনো এমন বক্তব্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে—‘এ দেশে জন্ম নেওয়াই পাপ।’
কথাটি আবেগপ্রসূত, অতিরঞ্জিত কিংবা হতাশার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কেন একজন তরুণ এমন কথা বলার প্রয়োজন বোধ করে?
এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।
আর সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ দেখা যায় রাজনৈতিক বক্তৃতা ও বাস্তব আচরণের ব্যবধানে।

মঞ্চে উঠে দেশপ্রেমের কথা বলা হয়। দেশের মানুষের জন্য জীবন উৎসর্গের কথা বলা হয়। জনগণের অধিকার রক্ষার শপথ শোনা যায়। কিন্তু রাজনীতিকের ব্যক্তিজীবন, সম্পদ, স্বার্থ ও কর্মকাণ্ড নিয়ে যখন প্রশ্ন ওঠে, তখন সেই কথিত আদর্শের সঙ্গে বাস্তবতার দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দেশপ্রেম যদি শুধু মঞ্চের মাইকে থাকে, আর জনস্বার্থ যদি শুধু নির্বাচনী ইশতেহারের পাতায় থাকে—তাহলে সেই দেশপ্রেমের মূল্য কতটুকু?
দেশ মানে শুধু পতাকা নয়।
দেশ মানে রমজান আলীর ঘামে ভেজা শরীর।
দেশ মানে মতির মায়ের বাজারের ব্যাগ।
দেশ মানে রহিম মিয়ার মাসের মাঝপথে ফুরিয়ে যাওয়া বেতন।
দেশ মানে করিম মিয়ার অপূর্ণ স্বপ্ন।
দেশ মানে কদম আলীর অটোরিকশার চাকা।
দেশ মানে সেই কিশোর, যে মাদকের বদলে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ পাওয়ার অধিকার রাখে।

তাই উন্নয়ন শুধু সেতু-সড়ক আর ভবনের সংখ্যা দিয়ে মাপা যাবে না। উন্নয়নের আসল মানদণ্ড মানুষের মুখের হাসি, নিরাপদ জীবন, ন্যায্য আয়, সুশাসন, জবাবদিহি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বস্তি।

আমরা এমন একটি দেশ চাই, যেখানে কৃষক ফসল ফলিয়ে বাঁচতে পারেন, শ্রমিক শ্রমের ন্যায্য মূল্য পান, চাকরিজীবী বেতন দিয়ে সংসার চালাতে পারেন, ব্যবসায়ী সৎভাবে ব্যবসা করতে পারেন এবং তরুণ মাদক নয়—স্বপ্নের নেশায় ডুবে থাকতে পারে।
প্রশ্নটা তাই খুব সরল—
আমরা কি শুধু উন্নয়নের গল্প শুনব, নাকি উন্নয়নের সুফলও মানুষের ঘরে পৌঁছাবে?
দিন বদলের গল্প অনেক হয়েছে।
এবার বদলানো দরকার মানুষের দিন।
কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সাফল্য বড় ভবনের উচ্চতায় নয়—সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা স্বস্তি ফিরেছে, তার মধ্যেই।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সর্বাধিক জনপ্রিয়

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- বিজ্ঞাপন -spot_img

সর্বশেষ